অধ্যায় ১

ভাষা ও ব্যাকরণ

ভাষা মানুষের ভাব প্রকাশের প্রধান মাধ্যম, আর ব্যাকরণ সেই ভাষার নিয়ম-শৃঙ্খলার শাস্ত্র। এই অধ্যায়ে ভাষা, বাংলা ভাষার ইতিহাস, ভাষারীতি ও ব্যাকরণ — চারটি বিষয়ে ভিত্তি গড়ব।

ভাষা

ভাষা কী, তার একক ও রূপভেদ।

সহজ করে বুঝি

ভাষা নিয়ে কঠিন কিছু ভেবো না — তুমি এই মুহূর্তে যা দিয়ে ভাবছ, বলছ, বুঝছ, সেটাই ভাষা। মুখের আওয়াজ যখন অর্থ বহন করে, তখনই তা ভাষা।

মনে রাখো — সবচেয়ে ছোট একক ‘ধ্বনি’, আর অর্থ বহন করে সবচেয়ে ছোট যা, তা ‘শব্দ’। এই দুটো পার্থক্যেই অনেক প্রশ্নের উত্তর।

সংজ্ঞা

মানুষের বাগ্‌যন্ত্র থেকে উচ্চারিত, অর্থবোধক ধ্বনি বা ধ্বনি-সমষ্টিকে ভাষা বলে। এর সাহায্যে মানুষ মনের ভাব প্রকাশ ও বিনিময় করে।

ভাষার প্রকাশ দুইভাবে — মৌখিক (কথ্য, আগে) ও লৈখিক (লেখ্য, পরে)।

ভাষার একক ও স্তরক্রম

  • ভাষার মূল উপাদান / ক্ষুদ্রতম একক — ধ্বনি
  • অর্থবোধক ক্ষুদ্রতম একক — শব্দ (রূপ)
  • স্তরক্রম: ধ্বনি → বর্ণ → শব্দ → পদ → বাক্য

অভিধানে থাকে ‘শব্দ’; বাক্যে বিভক্তিযুক্ত হয়ে ব্যবহৃত হলে তা ‘পদ’।

ভাষার রূপভেদ

  • আঞ্চলিক ভাষা (উপভাষা) — অঞ্চলভেদে ভিন্ন কথ্যরূপ
  • সাধু ও চলিত — লেখ্য ভাষার দুই আদর্শ রীতি
  • মান্য চলিতের ভিত্তি — নদীয়া-শান্তিপুর অঞ্চলের ভাষা

নিজে চেষ্টা করো

ভাষার ক্ষুদ্রতম একক কী, আর অর্থবোধক ক্ষুদ্রতম একক কী?

বাংলা ভাষার ইতিহাস

সহজ করে বুঝি

বাংলা কোনো আকাশ থেকে পড়া ভাষা নয় — এর একটা বংশতালিকা আছে। ইন্দো-ইউরোপীয় থেকে ধাপে ধাপে সংস্কৃত → প্রাকৃত → অপভ্রংশ হয়ে বাংলা এসেছে।

মনে রাখো একটাই সরল ধারা: গৌড়ীয় প্রাকৃত থেকে বাংলার জন্ম, বয়স হাজার বছরের মতো। এই ধারাটা মাথায় থাকলে ‘বাংলা কোন ভাষাগোষ্ঠীর’ ধরনের প্রশ্ন আর মিস হবে না।

উৎপত্তির ধারা

বাংলা একটি ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা। ধারা: ইন্দো-ইউরোপীয় → ভারতীয় আর্য → প্রাকৃত-অপভ্রংশ → বাংলা। সরাসরি উৎস — মাগধী প্রাকৃত/গৌড়ীয় অপভ্রংশ।

বয়স ও প্রাচীন নিদর্শন

  • জন্ম — খ্রিস্টীয় সপ্তম শতকের কাছাকাছি; বয়স ~১০০০–১৩০০ বছর
  • প্রাচীনতম নিদর্শন — চর্যাপদ (৯৫০–১২০০ খ্রি.)
  • চর্যাপদ আবিষ্কার — হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, ১৯০৭ (নেপাল)

মাতৃভাষীর সংখ্যায় বাংলা বিশ্বে চতুর্থ/পঞ্চম (সূত্রভেদে)।

নিজে চেষ্টা করো

বাংলা ভাষা কোন প্রাকৃত থেকে জন্ম নিয়েছে, বয়স আনুমানিক কত?

ভাষারীতি: সাধু ও চলিত

সহজ করে বুঝি

একই বাংলা দুই পোশাকে আসে — সাধু (ভারী, আনুষ্ঠানিক) আর চলিত (হালকা, মুখের ভাষা)।

চেনার সহজ চাবি ক্রিয়া আর সর্বনাম: ‘করিয়াছিলাম, তাহারা’ = সাধু; ‘করেছিলাম, তারা’ = চলিত। শব্দের লেজটা লম্বা হলে সাধু, ছোট হলে চলিত — এটুকু ধরলেই যেকোনো বাক্য চিনে ফেলবে।

পার্থক্য

  • সর্বনাম — সাধু: তাহারা, ইহাদের; চলিত: তারা, এদের
  • ক্রিয়া — সাধু: করিয়াছিল; চলিত: করেছিল
  • অনুসর্গ — সাধু: হইতে, দিয়া; চলিত: থেকে, দিয়ে

চলিত রীতির প্রবর্তক — প্রমথ চৌধুরী (‘সবুজপত্র’, ১৯১৪)।

গুরুচণ্ডালী দোষ

একই রচনায় সাধু ও চলিত রীতি মিশিয়ে ফেলাকে গুরুচণ্ডালী দোষ বলে।

  • ভুল: ‘গরুগুলো মাঠে চরিতেছে’

নিজে চেষ্টা করো

‘তাহারা করিয়াছিল’ কোন রীতি? চলিত রূপ কী?

ব্যাকরণ

সহজ করে বুঝি

ভাষা আগে, ব্যাকরণ পরে। মানুষ আগে কথা বলেছে, তারপর সেই কথার নিয়মগুলো খুঁজে বের করে সাজানো হয়েছে — সেটাই ব্যাকরণ।

তাই ব্যাকরণ ভাষাকে বানায় না, ভাষার নিয়ম ব্যাখ্যা করে। এর চারটে ভাগ (ধ্বনি, শব্দ, বাক্য, অর্থ) আসলে ভাষার চারটে স্তর — ছোট থেকে বড়।

সংজ্ঞা ও ব্যুৎপত্তি

যে শাস্ত্রে ভাষার উপাদান বিশ্লেষণ ও শুদ্ধ প্রয়োগের নিয়ম আলোচিত হয়, তা ব্যাকরণ। ‘ব্যাকরণ’ = বিশেষভাবে বিশ্লেষণ (বি + আ + √কৃ + অন)।

ব্যাকরণের ইতিহাস

  • প্রথম বাংলা ব্যাকরণ — পর্তুগিজ মানোএল দা আস্‌সুম্পসাঁউ (১৭৩৪–৪২)
  • প্রথম ইংরেজিতে — ন্যাথানিয়েল ব্রাসি হ্যালহেড (১৭৭৮)
  • প্রথম বাঙালি ব্যাকরণবিদ — রাজা রামমোহন রায়

ব্যাকরণের চার শাখা

  • ধ্বনিতত্ত্ব — ধ্বনি, বর্ণ, সন্ধি
  • রূপতত্ত্ব — শব্দ, প্রত্যয়, সমাস, পদ
  • বাক্যতত্ত্ব — কারক, বাচ্য, বাক্যগঠন
  • অর্থতত্ত্ব — শব্দ ও বাক্যের অর্থ

মনে রাখো — ‘ধ-রূ-বা-অ’।

নিজে চেষ্টা করো

ব্যাকরণের প্রধান চারটি আলোচ্য অংশ কী কী?

পরীক্ষার ফাঁদ

  • ভাষার ক্ষুদ্রতম একক ধ্বনি; অর্থবোধক ক্ষুদ্রতম একক শব্দ।
  • চলিত ভাষার প্রবর্তক প্রমথ চৌধুরী — বিদ্যাসাগর নন।
  • প্রথম বাংলা ব্যাকরণ লেখেন একজন পর্তুগিজ, বাঙালি নন।

মনে রাখার কৌশল

  • স্তরক্রম: ধ্বনি→বর্ণ→শব্দ→পদ→বাক্য।
  • ব্যাকরণের ৪ শাখা: ‘ধ-রূ-বা-অ’।

সারসংক্ষেপ · এক নজরে রিভিশন

  • ১.ক্ষুদ্রতম একক ধ্বনি; অর্থবোধক ক্ষুদ্রতম একক শব্দ; ভাব প্রকাশের একক বাক্য।
  • ২.বাংলা: ইন্দো-ইউরোপীয় → সংস্কৃত → প্রাকৃত (গৌড়ীয়) → অপভ্রংশ → বাংলা; বয়স ১০০০+ বছর।
  • ৩.সাধু = ভারী, ক্রিয়া-সর্বনাম দীর্ঘ (করিয়াছিল, তাহারা); চলিত = হালকা (করেছিল, তারা)।
  • ৪.ব্যাকরণের ৪ অংশ: ধ্বনি, শব্দ/রূপ, বাক্য, অর্থতত্ত্ব। ভাষা আগে, ব্যাকরণ পরে।
আগের অধ্যায়ধ্বনি ও বর্ণ