অধ্যায় ৮
সমাস
পরস্পর অর্থসম্বন্ধযুক্ত একাধিক পদ মিলে এক পদে পরিণত হওয়াকে সমাস বলে। যে বাক্যাংশ দিয়ে সমাস ভাঙা হয়, তাকে ব্যাসবাক্য বা সমাসবাক্য বলে।
সমাস পরিচিতি
সহজ করে বুঝি
সন্ধি ছিল ধ্বনির মিলন; সমাস হলো অর্থের মিলন — অর্থসম্পর্কযুক্ত একাধিক পদ মিলে এক পদ।
‘নীল যে পদ্ম’ বলতে লম্বা, তাই ছোট করে ‘নীলপদ্ম’। যে বাক্য দিয়ে ভাঙা হয় তাকে বলে ব্যাসবাক্য। মূল কৌশল — ব্যাসবাক্যে কোন পদের অর্থ প্রধান, সেটা দেখেই সমাস চেনা যায়।
সংজ্ঞা ও অংশ
সমাসের প্রথম পদ পূর্বপদ, শেষ পদ পরপদ/উত্তরপদ। সমাস প্রধানত ছয় প্রকার।
- সমাস ভাঙা = ব্যাসবাক্য (নীল যে পদ্ম = নীলপদ্ম)
ছয় সমাস — এক নজরে
| সমাস | কোন পদ প্রধান | চেনার উপায় | উদাহরণ |
|---|---|---|---|
| দ্বন্দ্ব | উভয় পদ | ব্যাসবাক্যে ‘ও/এবং/আর’ | মা-বাবা |
| কর্মধারয় | পরপদ | বিশেষণ + বিশেষ্য | নীলপদ্ম |
| তৎপুরুষ | পরপদ | পূর্বপদের বিভক্তি লোপ | বিপদাপন্ন |
| দ্বিগু | পরপদ (সমষ্টি) | সংখ্যাবাচক পূর্বপদ | তেমাথা |
| বহুব্রীহি | কোনোটিই নয় (তৃতীয় অর্থ) | ‘যার/যাহার’ | দশানন |
| অব্যয়ীভাব | পূর্বপদ (অব্যয়) | পূর্বপদ অব্যয় | আমরণ |
চেনার উপায় কলামটাই MCQ সমাধানের চাবি — ব্যাসবাক্য দেখে সমাস চেনা যায়।
নিজে চেষ্টা করো
সমাসের মিলিত রূপ ও বিশ্লেষণকে কী বলে?
ছয় প্রকার সমাস
সহজ করে বুঝি
ছয় ভাইকে চেনার আলাদা আলাদা চিহ্ন আছে — কোন পদ প্রধান, সেটাই আসল সূত্র।
পরেরটা প্রধান (তৎপুরুষ, কর্মধারয়), আগেরটা প্রধান (অব্যয়ীভাব), দুটোই প্রধান (দ্বন্দ্ব), কোনোটাই নয় বাইরের কিছু বোঝায় (বহুব্রীহি), সংখ্যা প্রধান (দ্বিগু)। ব্যাসবাক্য করলেই কে প্রধান ধরা পড়ে।
দ্বন্দ্ব সমাস
উভয় পদের অর্থ প্রাধান্য পায়; ব্যাসবাক্যে ‘ও/এবং’ থাকে।
- মা ও বাবা = মা-বাবা
- দা ও কুমড়া = দা-কুমড়া
কর্মধারয় সমাস
বিশেষণ ও বিশেষ্যের মিলন; পরপদের অর্থ প্রাধান্য।
- নীল যে পদ্ম = নীলপদ্ম
- মহান যে নবি = মহানবি
তৎপুরুষ সমাস
পূর্বপদের বিভক্তি লোপ পায়; পরপদের অর্থ প্রাধান্য।
- বিপদকে আপন্ন = বিপদাপন্ন
- ঘোড়ার গাড়ি = ঘোড়গাড়ি
দ্বিগু সমাস
সংখ্যাবাচক পূর্বপদ; সমষ্টি বোঝায়।
- তিন মাথার সমাহার = তেমাথা
- সপ্ত অহের সমাহার = সপ্তাহ
বহুব্রীহি সমাস
কোনো পদেরই অর্থ প্রাধান্য পায় না; তৃতীয় কিছু বোঝায়।
- দশ আনন যার = দশানন (রাবণ)
- নীল কণ্ঠ যার = নীলকণ্ঠ (শিব)
অব্যয়ীভাব সমাস
পূর্বপদ অব্যয়; অব্যয়ের অর্থ প্রাধান্য।
- মরণ পর্যন্ত = আমরণ
- কণ্ঠ পর্যন্ত = আকণ্ঠ
তৎপুরুষ সমাসের উপবিভাগ (বিভক্তি অনুযায়ী)
| উপবিভাগ | লুপ্ত বিভক্তি | উদাহরণ (ব্যাসবাক্য → সমাস) |
|---|---|---|
| দ্বিতীয়া তৎপুরুষ | -কে, -রে | দুঃখকে প্রাপ্ত = দুঃখপ্রাপ্ত |
| তৃতীয়া তৎপুরুষ | দ্বারা, দিয়া | জ্ঞান দ্বারা শূন্য = জ্ঞানশূন্য; মধু দিয়ে মাখা = মধুমাখা |
| চতুর্থী তৎপুরুষ | জন্য, নিমিত্ত | বসতের জন্য বাড়ি = বসতবাড়ি; হজ্বের নিমিত্ত যাত্রা = হজ্বযাত্রা |
| পঞ্চমী তৎপুরুষ | হইতে, থেকে | জেল থেকে খালাস = জেলখালাস; স্কুল থেকে পালানো = স্কুলপালানো |
| ষষ্ঠী তৎপুরুষ | -র, -এর | রাজার পুত্র = রাজপুত্র; বিদ্যার আলয় = বিদ্যালয় |
| সপ্তমী তৎপুরুষ | -এ, -তে | দানে বীর = দানবীর; গৃহে প্রবেশ = গৃহপ্রবেশ |
ষষ্ঠী তৎপুরুষ (-র/-এর লোপ) BCS-এ সবচেয়ে বেশি আসে — রাজপুত্র, বিদ্যালয়, ছাত্রাবাস।
কর্মধারয় সমাসের উপবিভাগ
| উপবিভাগ | গঠন | উদাহরণ |
|---|---|---|
| মধ্যপদলোপী | মধ্যের পদ লোপ পায় | সিংহ চিহ্নিত আসন = সিংহাসন; ঘি মাখা ভাত = ঘিভাত |
| উপমান কর্মধারয় | উপমান + সাধারণ ধর্ম | তুষারের ন্যায় শুভ্র = তুষারশুভ্র; ভ্রমরের ন্যায় কৃষ্ণ = ভ্রমরকৃষ্ণ |
| উপমিত কর্মধারয় | উপমেয় + উপমান | পুরুষ সিংহের ন্যায় = পুরুষসিংহ; মুখ চন্দ্রের ন্যায় = মুখচন্দ্র |
| রূপক কর্মধারয় | উপমেয় ও উপমান অভেদ (‘রূপ’) | মন রূপ মাঝি = মনমাঝি; ক্রোধ রূপ অনল = ক্রোধানল |
উপমান = যার সঙ্গে তুলনা; উপমেয় = যাকে তুলনা করা হয়; সাধারণ ধর্ম দুয়ের মিল।
আরও কয়েকটি সমাস (নঞ, উপপদ, প্রাদি, অলুক, নিত্য)
| সমাস | চেনার উপায় | উদাহরণ |
|---|---|---|
| নঞ তৎপুরুষ | না-বাচক অব্যয় পূর্বপদ | ন সুখ = অসুখ; ন জ্ঞান = অজ্ঞান |
| উপপদ তৎপুরুষ | কৃদন্ত পদ পরপদে | জলে চরে যা = জলচর; ছেলে ধরে যে = ছেলেধরা |
| প্রাদি সমাস | উপসর্গ পূর্বপদে | প্র গতি = প্রগতি; পরি ভ্রমণ = পরিভ্রমণ |
| অলুক সমাস | বিভক্তি লোপ পায় না | ঘোড়ার ডিম, হাতে-খড়ি, কলে-ছাঁটা |
| নিত্য সমাস | ব্যাসবাক্য হয় না | অন্য গ্রাম = গ্রামান্তর; কেবল দর্শন = দর্শনমাত্র |
নিজে চেষ্টা করো
‘মাতাপিতা’ ও ‘তেপান্তর’ — কোনটি দ্বন্দ্ব, কোনটি দ্বিগু?
পরীক্ষার ফাঁদ
- দ্বন্দ্ব — উভয় পদ প্রধান; বহুব্রীহি — কোনো পদই প্রধান নয় (তৃতীয় অর্থ)।
- সমাস অর্থ/পদের মিলন; সন্ধি ধ্বনির মিলন।
মনে রাখার কৌশল
- ব্যাসবাক্যে ‘ও/এবং’ → দ্বন্দ্ব; ‘যার/যাহার’ → বহুব্রীহি; সংখ্যা → দ্বিগু।
সারসংক্ষেপ · এক নজরে রিভিশন
- ১.সমাস = একাধিক পদ মিলে এক পদ; মিলিত রূপ সমস্তপদ, বিশ্লেষণ ব্যাসবাক্য।
- ২.কোন পদ প্রধান, তা দিয়ে ৬ প্রকার চেনা: পর-প্রধান (তৎপুরুষ/কর্মধারয়), পূর্ব-প্রধান (অব্যয়ীভাব), উভয়-প্রধান (দ্বন্দ্ব), বাইরের অর্থ (বহুব্রীহি), সংখ্যা-প্রধান (দ্বিগু)।
- ৩.কর্মধারয়ে পরপদ বিশেষ্য, বহুব্রীহিতে সমস্ত পদ তৃতীয় কিছু বোঝায়।