অধ্যায় ৫

শব্দ ও শব্দের শ্রেণি

এক বা একাধিক ধ্বনি মিলে অর্থবোধক একককে শব্দ বলে। উৎস, গঠন ও অর্থ — তিন দিক থেকে শব্দকে শ্রেণিবদ্ধ করা যায়।

উৎস অনুযায়ী শব্দ

সহজ করে বুঝি

শব্দ কোথা থেকে এসেছে, তা দিয়েই তার শ্রেণি — অনেকটা মানুষের বংশপরিচয়ের মতো।

সংস্কৃত থেকে সোজা এলে তৎসম (চন্দ্র), সংস্কৃত ভেঙেচুরে এলে খাঁটি বাংলা/তদ্ভব (হাত), আর বিদেশ থেকে এলে বিদেশি (কলম)। শব্দটা শুনলেই আন্দাজ করা যায় কোন ঘর থেকে এসেছে।

পাঁচ শ্রেণি

  • তৎসম — সংস্কৃত থেকে অবিকৃত: চন্দ্র, সূর্য, নক্ষত্র, ভবন
  • অর্ধতৎসম — সংস্কৃত থেকে কিছুটা পরিবর্তিত: জোছনা, কিরপা, বোষ্টম
  • তদ্ভব — প্রাকৃতের মধ্য দিয়ে পরিবর্তিত (খাঁটি): হাত, চাঁদ, মাথা
  • দেশি — অনার্য/আদিবাসী উৎস: কুলা, ঢেঁকি, চোঙা, ডাব
  • বিদেশি — আরবি/ফারসি/ইংরেজি প্রভৃতি: কলম, চেয়ার, স্কুল

উৎস অনুযায়ী পাঁচ শ্রেণি (তালিকা)

শ্রেণিপরিচয়উদাহরণ
তৎসমসংস্কৃত থেকে অবিকৃতচন্দ্র, সূর্য, নক্ষত্র, হস্ত, মস্তক, ভবন
অর্ধতৎসমসংস্কৃত থেকে কিছুটা বিকৃতজ্যোৎস্না→জোছনা, কৃপা→কিরপা, গ্রাম→গেরাম
তদ্ভবপ্রাকৃত হয়ে বিবর্তিত (খাঁটি)হস্ত→হাত, চন্দ্র→চাঁদ, মস্তক→মাথা
দেশিঅনার্য/আদিবাসী উৎসকুলা, ঢেঁকি, চোঙা, ডাব, ঝিঙা, কুড়ি
বিদেশিআরবি/ফারসি/ইংরেজি প্রভৃতিকলম, চেয়ার, স্কুল, আলমারি, চাবি

বিদেশি শব্দের উৎস-ভাষা (BCS-এ ঘন আসে)

উৎস ভাষাউদাহরণ
আরবিআল্লাহ, ঈমান, ওজু, কিতাব, দুনিয়া, হজ, কলম
ফারসিনামাজ, রোজা, বেহেশত, দোজখ, চশমা, দরবার, বাগান
ইংরেজিস্কুল, কলেজ, অফিস, টেবিল, পেন্সিল, ডাক্তার
পর্তুগিজআলমারি, চাবি, বালতি, আনারস, গির্জা, পাউরুটি, সাবান
তুর্কিচাকু, তোপ, বাবা, বেগম, কুলি, দারোগা, চাকর
ফরাসি (ফ্রেঞ্চ)কার্তুজ, রেস্তোরাঁ, ডিপো, ব্যুরো
হিন্দিপানি (কথ্য), চাহিদা, কাহিনি, খামোখা, বাচ্চা
জাপানিরিকশা, হারিকিরি, প্যাগোডা
চীনাচা, চিনি, লিচু

নিজে চেষ্টা করো

‘চাঁদ’ কোন শ্রেণির শব্দ, কীভাবে এসেছে?

গঠন অনুযায়ী শব্দ

সহজ করে বুঝি

শব্দকে ভেঙে দেখো — একটা টুকরো, নাকি জোড়া লাগানো? সেই গড়নেই শব্দ তিন ভাগ।

আর ভাঙা যায় না (হাত, বই) = মৌলিক; দুটো জোড়া (হাতঘড়ি) = সাধিত/যৌগিক; পুরোটা মিলে নতুন অর্থ (রাজপুত = বীর) = রূঢ়ি। শব্দটা ভেঙে দেখলেই শ্রেণি বেরিয়ে আসে।

মৌলিক ও সাধিত

  • মৌলিক — ভাঙা যায় না: হাত, নাক, গোলাপ
  • সাধিত — প্রত্যয়/উপসর্গ/সমাস/সন্ধিযোগে গঠিত: হাতল, চলন্ত, নীলপদ্ম

গঠন অনুযায়ী শব্দ (সাধিতের উপবিভাগসহ)

প্রকারগঠনউদাহরণ
মৌলিক শব্দআর ভাঙা যায় নাহাত, নাক, গোলাপ, নদী
সাধিত — প্রত্যয়জাতশব্দ/ধাতু + প্রত্যয়হাত+ল=হাতল, চল্‌+অন্ত=চলন্ত, গায়ক
সাধিত — উপসর্গজাতউপসর্গ + শব্দপ্র+গতি=প্রগতি, উপ+কার=উপকার
সাধিত — সমাসজাতএকাধিক পদ মিলেনীলপদ্ম, সিংহাসন, মা-বাবা
সাধিত — সন্ধিজাতধ্বনির মিলনেহিম+আলয়=হিমালয়, বিদ্যা+আলয়=বিদ্যালয়

নিজে চেষ্টা করো

‘হাতঘড়ি’ ও ‘রাজপুত’ — কোনটি যৌগিক, কোনটি রূঢ়ি?

অর্থ অনুযায়ী শব্দ

সহজ করে বুঝি

শব্দ কখনো ঠিক তার আভিধানিক অর্থে বসে, কখনো বাঁকা অর্থে — সেই অর্থের ধরন দিয়েই এই ভাগ।

‘মাথা’ শব্দটাই ভাবো: মাথা ব্যথা (সোজা/বাচ্যার্থ), মাথা খাটাও (বুদ্ধি/লক্ষ্যার্থ), মাথা বিকিয়ে দেওয়া (ব্যঙ্গ/ব্যঙ্গার্থ)। প্রসঙ্গ দেখে বুঝতে হবে শব্দ কোন অর্থে বসেছে।

যৌগিক, রূঢ়ি ও যোগরূঢ়

  • যৌগিক — প্রকৃতি-প্রত্যয়ের অর্থ বজায়: গায়ক (গায় যে), দৌহিত্র
  • রূঢ়ি — ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হারিয়ে নতুন অর্থ: হস্তী (হাত আছে যার নয়, ‘হাতি’), বাঁশি
  • যোগরূঢ় — সমাসনিষ্পন্ন কিন্তু নির্দিষ্ট অর্থে সীমিত: পঙ্কজ (কেবল পদ্ম), মহাযাত্রা

অর্থ অনুযায়ী শব্দ (তালিকা)

প্রকারপরিচয়উদাহরণ
যৌগিকঅংশের অর্থ বজায় থাকেগায়ক (গান করে যে), দৌহিত্র, কর্তব্য
রূঢ়ি/রূঢ়ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হারিয়ে নতুন অর্থহস্তী (=হাতি), বাঁশি, তৈল, প্রবীণ, সন্দেশ
যোগরূঢ়সমাসবদ্ধ কিন্তু নির্দিষ্ট অর্থে সীমিতপঙ্কজ (কেবল পদ্ম), জলধি, রাজপুত, মহাযাত্রা (মৃত্যু)

যোগরূঢ় ফাঁদ: ‘পঙ্কজ’ অর্থ ‘পাঁকে জন্মে যা’ হলেও শুধু পদ্মকেই বোঝায় — শাপলা/শালুককে নয়।

নিজে চেষ্টা করো

‘মাথা খাটাও’ — এখানে ‘মাথা’ কোন অর্থে বসেছে?

পরীক্ষার ফাঁদ

  • তদ্ভব = খাঁটি বাংলা শব্দ (প্রাকৃতের ধারায়)।
  • ‘পঙ্কজ’ যোগরূঢ় (শুধু পদ্ম বোঝায়, শামুক নয়)।

মনে রাখার কৌশল

  • উৎসের ক্রম মনে রাখো: তৎসম-অর্ধতৎসম-তদ্ভব-দেশি-বিদেশি।

সারসংক্ষেপ · এক নজরে রিভিশন

  • ১.উৎস: তৎসম (চন্দ্র), অর্ধ-তৎসম, তদ্ভব (চাঁদ), দেশি, বিদেশি।
  • ২.গঠন: মৌলিক (হাত), সাধিত/যৌগিক (হাতঘড়ি), রূঢ়ি (রাজপুত), যোগরূঢ় (পঙ্কজ)।
  • ৩.অর্থ: বাচ্যার্থ (সোজা), লক্ষ্যার্থ (গৌণ), ব্যঙ্গার্থ।